নন্দিতা মিত্র

ইতিহাস ছুঁয়ে এসে

#####

ছোটবেলা থেকেই ইতিহাসের প্রতি আমার টান খুব বেশি। বিশেষ করে কোনও জায়গার পুরনো দিনের ইতিহাস আমাকে ভীষণভাবে টানে। তাই ডিসেম্বরের ভরা শীতে যখন রাজগির যাওয়ার কথা উঠল তখন তো আনন্দে আত্মহারা।

 মনের প্রোজেক্টারে একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল মৌর্য বংশ, হিউয়েন সাং, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, বিম্বিসার, অজাতশত্রুর স্লাইডিং শো। ঠিক হল দিনের একটা ছোট্ট ট্যুরে ঘুরে আসব রাজগির, নালন্দা, বোধগয়ায়। নির্ধারিত দিনে কোলকাতা স্টেশন থেকে রওনা হলাম বক্তিয়ারপুরের উদ্যেশ্যে। এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের রাজগির ভ্রমণ।


ট্রেন চলতে চলতে রাজগিরের সাথে প্রাথমিক পরিচয়পর্বটা সেরে নেওয়া যাক। রাজগির জায়গাটা ছোট হলেও ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। শোনা যায় পাটুলিপুত্র তৈরি হওয়ার আগে রাজগির মহাজনপদের রাজধানী ছিল। অজাতশত্রুর পুত্র উদয়ন রাজগির থেকে পাটুলিপুত্রে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। সেই সময় এই জায়গাকে বলা হত রাজগৃহ’ বা রাজার বাড়ি। বৈভার, বিপুল, রত্নগিরি, উদয়গিরি, শোনগিরি - চক্রাকারে এই পাঁচটি পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত রাজগির ছিল সেই সময়ের এক সমৃদ্ধ নগর। কথিত আছে এই রাজগিরেই দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমের হাতে মৃত্যু হয় জরাসন্ধের। গৌতমবুদ্ধও বোধগয়ায় বোধিলাভ করে এখানেই উপস্থিত হয়েছিলেন।

পরদিন খুব ভোরে বক্তিয়ারপুর স্টেশনে নেমে আগেই বলে রাখা হোটেলের গাড়ি সোজা আমাদের নিয়ে গেল রাজগিরের হোটেলে। সময় লাগল ঘণ্টা। লাঞ্চ করার পর বেরিয়ে পড়লাম নালন্দার উদ্দ্যেশে। রাজগির থেকে নালন্দার দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি। পথে যেতে যেতে মনের মধ্যে উঁকি মারছিল ইতিহাসের বইতে দেখা নালন্দার ছবিটা। যখন কাছে পৌঁছালাম তখন যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। লোকে মনে করে যা কিছু মৃত তাই ইতিহাস। কিন্তু এখানে এসে বুঝলাম ইতিহাস বেঁচে থাকে তার উষ্ণতায়। এই সেই নালন্দা যা একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। বিহারের যত দর্শনীয় স্থান আছে সেগুলোর মধ্যে নালন্দার স্থান সবার ওপরে এই স্থানের মাহাত্মের জন্যই পৃথিবীর দুর-দুরান্ত থেকে পর্যটকরা আজও আসেন। নালন্দা মূলত বৌদ্ধদের পঠন-পাঠনের জন্য বিখ্যাত ছিল। সারা পৃথিবী থেকে এখানে বৌদ্ধ ছাত্ররা পড়তে আসতেন। প্রায় ১০০০০ ছাত্র এখানে একসাথে পড়তে পারতেন আর প্রায় ২০০০ আচার্য পড়াতেন। পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তখনকার কর্মকাণ্ড, পড়াশোনা, শিল্প, সাহিত্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর লিখিত গ্রন্থে বর্ণনা করেন। সম্রাট আশোকের হাতে এর পত্তন হয়ে গুপ্তরাজা কুমারগুপ্তের হাতে সম্পূর্ণ হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন রাজাদের দানে চলা এই সুবিশাল বিশ্ববিদ্যালয় লাল রঙয়ের ইঁটের পর ইঁট গেঁথে তৈরি করা হয়। গাইড বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ছাত্রদের পড়ার জন্য সার দেওয়া ছোট ছোট ঘরে থাকা শোওয়ার ব্যাবস্থা ছিল। তিনি আরও বললেন বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তখন আলোর ব্যবস্থা করা হত। ছোট ছোট কুলুঙ্গিতে অভ্রের চাঙড় রেখে দেওয়া হত। বাইরে থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে পুরো ঘরই আলোকিত হয়ে উঠত। দেওয়ালে দেওয়ালে বুদ্ধদেবের অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথাও খোদাই করা আছে। কিন্তু কালের গর্ভে আজ সবই বিলীন। বইয়ের পাতায় দেখা সেই বহুচর্চিত ছবিটি আসলে একটি সরস্বতী মন্দির। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় বিভিন্ন শত্রুরা আক্রমণ করে। শোনা যায় আলাউদ্দিন খিলজি এখানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আগুনে এখানকার বই প্রায় দুমাস ধরে পুড়েছিল। আজ চোখের সামনে অতীত গৌরবের এই ধ্বংসস্তুপ দেখে একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’ সামনের বাগানটিও বেশ সুন্দর। সেখানে শীতকালীন নানা বর্ণের ফুল ফুটে আছে।


নালন্দার ধ্বংসাবশেষের বিপরীতেই আছে নালন্দা মিউজিয়াম। টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম মিউজিয়ামে। এটি আসলে প্রাচীন ভারতের শিল্পকলার সংগ্রহশালা। বিহারের বিভিন্ন জায়গায় খননকার্য করে পাওয়া বিভিন্ন সামগ্রী এখানে সযত্নে রাখা আছে।

ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার পর আমরা গেলাম কুন্দলপুর দিগম্বর মন্দির। সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত সাদা মার্বেলের এই মন্দির দেখে চললাম হিউয়েন সাং মেমোরিয়াল হল। পরের গন্তব্য জৈন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান পাওয়াপুরী। চারিদিকে জলাশয়ের মাঝে শ্বেতপাথরের সুন্দর একটি মন্দির। মন্দিরশৈলীতে জৈন স্থাপত্যের চিহ্ন সুস্পষ্ট। কড়া সিকিউরিটি পেরিয়ে জলমন্দিরে প্রবেশ করলাম। মন্দিরের ভিতরে চতুর্দিকে ঝকঝকে, তকতকে। এমন পরিবেশে এসে স্বভাবতই মন ভালো হয়ে যায়। মন্দিরের পণ্ডিতজি জানালেন পাওয়াপুরী একসময় মগধের অন্তর্গত ছিল। সম্রাট বিম্বিসার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেও ছেলে অজাতশত্রু জৈনধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। মনে মনে ভাবলাম দুজনেই অহিংস ধর্মের পূজারি হওয়া সত্ত্বেও পিতা-পুত্রের মধ্যে কতই না রক্তক্ষরণ হয়ে গেছে। পণ্ডিতজির কাছেই শুনলাম এই মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। গর্ভগৃহে তিনটি চরণপাদুকা রাখা আছে। মাঝেরটি ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের এবং বাকি দুটো তাঁর দুই শিষ্যের। মহাবীর জৈনের এখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁর শেষকৃত্যের পর ভক্তগণ এই স্থানের মাটি নিয়ে যান। হাজার হাজার ভক্ত মাটি নিয়ে যাওয়ার ফলে এখানে বিরাট একটি গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে বর্ষার জলে সরোবর তৈরি হয়। পণ্ডিতজি আরও বললেন মে-জুন মাসে এই সরোবরে যখন হাজার হাজার পদ্মফুল ফোটে তখন এর প্রকৃত সৌন্দর্য বোঝা যায়। দীপাবলির রাতে অসংখ্য প্রদীপের আলোয় সেজে ওঠে এই জলমন্দির। সারা পৃথিবী থেকে এখানে ভক্তরা আসেন। আজ আমাদের ঘোরা এখানেই সমাপ্ত। ফিরে এলাম রাজগিরের হোটেলে।

তৃতীয় দিন সকালবেলা চলে গেলাম হোটেলের বিপরীতে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনে। মিশনের প্রাতঃকালীন প্রার্থনা সেরে পায়ে হেঁটেই দেখে নিলাম নওলখা জৈন মন্দির, বার্মিজ বুদ্ধ মন্দির। হোটেলে ফিরে এসে প্রাতঃরাশ সেরে রাজগিরের বাকি দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে যাওয়ার জন্য একটি টাঙ্গা ঠিক করে নিলাম। এখানে বলে রাখা ভালো যে রাজগিরের স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলো টাঙ্গায় করেই সবাই দেখে। বহুদিন আগে মুর্শিদাবাদে টাঙ্গায় চড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তবে এখানকার টাঙ্গাওয়ালারা খুব সুন্দরভাবে রঙিন কাগজ, রাংতা আর প্লাস্টিক ফুল দিয়ে টাঙ্গাগুলো সাজিয়ে রাখে। বসার জায়গাটিও বেশ আরামদায়ক। লাল ভেলভেট কাপড় দিয়ে মোড়া গদি। ঘোড়াগুলোকেও বেশ সাজগোজ করানো থাকে। ঘোড়াদের নামেই টাঙ্গার নাম। আমাদের ঘোড়ার নাম ‘পবন’। লোহার পাদানিতে ভর করে চড়ে বসতেই টাঙ্গার চালক বিকট এক হুংকার দিয়ে টাঙ্গা চালাতে শুরু করলেন। চারিদিকের পরিবেশ ঘোড়ার খুরের খটাখট আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল।

টাঙ্গায় চড়ে প্রথমেই গেলাম ‘বেণুবন’। এই জায়গা আদতে একটি বাঁশবন। তবে এখানকার বাঁশগুলি খুব সুগন্ধি। কথিত আছে সম্রাট বিম্বিসার সর্বপ্রথম এই স্থানটিই বুদ্ধদেবকে দান করেছিলেন তাঁর ধর্মচর্চার জন্য। স্থানমাহাত্ম্য কিনা জানি না, তবে এখানকার বন্যজন্তুরা দেখলাম যথেষ্ট শান্ত। পরের গন্তব্য ‘মনিয়ার মঠ’। এটি একটি বৌদ্ধস্তুপ। অন্যান্য বৌদ্ধস্তুপের সাথে এখানকার পার্থক্য হল এর ভিতরটা ফাঁপা। দেওয়ালে বুদ্ধের ছবির পাশাপাশি নাগদেবীরও কিছু ছবি আছে। কথিত আছে রাজগিরের দেবতা মণিনাগের আরাধনার স্থান ছিল এই ‘মনিয়ার মঠ’। খননকার্য চলার সময় এখান থেকে পাওয়া মণিনাগের নাম খোদাই করা মূর্তি, মাটির পাত্র নালন্দার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

এরপর গেলাম ‘সোনভাণ্ডার’ বা ‘সোনার ভাণ্ডার’। টাঙ্গা থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পর দেখা গেল একটি অনতিউচ্চ পাহাড়। এই পাহাড়ের নামই ‘সোনভাণ্ডার’। মনে করা হয় যে এখানেই সম্রাট বিম্বিসারের সোনাদানা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হল এই পাহাড়ের পুরোটাই একটি বড় পাথর কেটে তৈরি এবং মনে করা হয় এর ভিতরে বড় কক্ষ আছে। দেওয়ালে শঙ্খলিপিতে স্বর্ণভাণ্ডারে প্রবেশ করার গুপ্ত সংকেত লেখা আছে যা আজ পর্যন্ত কেউই পড়ে উদ্ধার করতে পারে নি। স্থানীয় গাইডও জানালেন ইংরেজ আমলেও অনেকে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গুপ্তলিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি বলে ‘ স্বর্ণভাণ্ডার’ অধরাই থেকে গেছে।


এরপর গেলাম ‘শ্রীকৃষ্ণের রথের চাকা’ দেখতে। কথিত আছে শ্রীকৃষ্ণ যখন রাজগৃহে আসেন তখন তাঁর রথের প্রচণ্ড গতি ও শক্তিতে একটি পাথরের ওপর চাকার দাগ বসে যায়। এই পাথরের পাশে বেশ কিছু শিলালিপি আছে যার পাঠোদ্ধার করা আজও সম্ভব হয় নি। এরপর দেখতে গেলাম ‘জীবকের আমবন’। এই জায়গাটি একটি আমবন। শোনা যায় আমবাগান দিয়ে ঘেরা এই জায়গা একসময় মগধের রাজ চিকিৎসক জীবকের বাসস্থান ছিল। দেবদত্ত দ্বারা যখন গৌতম বুদ্ধ আহত হন, তখন তাঁকে এই জায়গাতেই আনা হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। পরে জীবক এই জায়গায় বৌদ্ধবিহার স্থাপন করে বুদ্ধদেবকে দান করেছিলেন।

পথে যেতে যেতে আরও ছোটোখাটো কয়েকটা জায়গা দেখে চলে গেলাম রাজগিরের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা ‘বিশ্বশান্তিস্তুপ’। এখানে রোপওয়ে করে যেতে হয়। ১৯৬৫ সালে রত্নগিরি পাহাড়ে তৈরি হয় বিশ্বশান্তিস্তুপ ও জাপানি পিস প্যাগোডা। ৪০ মিটার স্তুপের চারিদিকে বুদ্ধদেবের চারটি সোনালি মূর্তি জীবনের চার অধ্যায়কে নির্দেশ করছে। স্তুপের অপর থেকে নীচের অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। বিশ্বশান্তিস্তুপ দেখে ফেরার সময় দেখে নিলাম ‘ঘোড়াকাটোরা লেক’। লেকের মাঝে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। বোটিং করারও সুন্দর ব্যবস্থা আছে।

এবার ফেরার পালা। পথেই দেখে নিলাম ‘বিম্বিসার জেল’। এখানেই সম্রাট বিম্বিসারকে তাঁর পুত্র অজাতশত্রু বন্দী করে রেখেছিলেন। গাইডের মুখেই শুনলাম এই জায়গাটা নাকি বিম্বিসার নিজেই পছন্দ করেছিলেন বন্দী থাকার জন্য, যাতে এখান থেকেই তিনি গৃধকূট পাহাড়ের এক গুহাতেই ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যগণ সাধনা করতেন। বর্তমানে এই জেল ধ্বংসপ্রায়। এখানে এখন জেলের পাঁচিলের একটা অংশ শুধুমাত্র অবশিষ্ট আছে।

এরপর গেলাম আজকের শেষ গন্তব্য জৈনমন্দির ও মিউজিয়াম ‘বিরায়তন’ দেখতে। মিউজিয়ামের সামনে সুন্দর করে সাজানো বাগান। মিউজিয়ামের ভিতরে জৈনধর্মের বিভিন্ন কাহিনী মডেলের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।

বিকেলে গেলাম রাজগিরের অন্যতম বিশেষ স্থান উষ্ণ প্রস্রবণ দেখতে। বৈভবগিরি পাহাড়ের নীচে অবস্থিত সাতটি ধারায় নেমে এসেছে এই উষ্ণপ্রস্রবণ। সবথেকে বেশি উষ্ণ ব্রহ্মকুণ্ড, প্রায় ৪৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড উষ্ণতা। সপ্তপর্ণি গুহা থেকে এদের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। এখানে অনেকগুলো মন্দির রয়েছে। মন্দির চত্বরে রয়েছে রকমারি জিনিসের দোকান। সন্ধ্যাবেলায় পুরো এলাকা জুড়ে যেন মেলা বসে গেছে। অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। বাইরে প্রচণ্ড শীত। বিহারে যে মারাত্মক শীতের কথা শুনেছিলাম তার কিছুটা অনুধাবন করতে পারলাম।

চতুর্থদিন আমাদের সারাদিনের প্রোগ্রাম গয়া ও বোধগয়ায়রাজগির থেকে বোধগয়ার দূরত্ব প্রায় ৭১ কিমি। পথেই দেখে নিলাম দশরথ মাঝির পাহাড় কেটে বের করা সেই সুবিশাল রাস্তা। ২২ বছর শুধু ছেনি আর হাতুড়ির দ্বারা একটা পাহাড় কেটে রাস্তা! আজকের যুগে দাঁড়িয়ে ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। গয়ায় পৌঁছে ফল্গুনদীর ধারে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে সোজা চলে এলাম বোধগয়ায়। এখানে দর্শনীয় স্থান অনেক। প্রথমেই দেখে নিলাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধমন্দিরগুলোর আদলে তৈরি এখানকার ১২টি বৌদ্ধমন্দির। প্রত্যেকটি মন্দিরের অপরূপ কারুকাজ দেখে মন ভরে যায়। এরপর গেলাম ৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বৌদ্ধমূর্তি দেখতে। এখান থেকে চলে গেলাম বোধগয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত মহাবোধি টেম্পেলে। প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাসে এখানে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ সম্মেলন হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বৌদ্ধসম্প্রদায়ের মানুষ এখানে এসে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। আমরাও ঠিক এই সময়ই গিয়েছিলাম। ‘বোধিবৃক্ষে’র তলায় প্রার্থনারত বৌদ্ধলামাদের দেখে অশান্ত মন শান্ত হয়ে যায়। শয়ে শয়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর মানুষ রয়েছেন মন্দিরের ভিতর। অথচ কী অদ্ভুত নীরবতা বজায় রয়েছে পুরো মন্দির জুড়ে। এই অপূর্ব পরিবেশ ছেড়ে যেতে মন একেবারেই চাইছিল না। কিন্তু আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে রাজগিরে। তাই খুব অনিচ্ছা সহকারে গাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

সন্ধেবেলা বোধগয়া থেকে রাজগিরে ফেরার সময় এক জায়গায় দেখি ড্রাইভারদাদা খুব স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছেন। কারণ জিজ্ঞাসা করতে জানালেন যে এখানকার আশেপাশের পাহাড় থেকে নাকি বন্যজন্তুরা বিশেষ করে নীলগাই নেমে আসে এবং চলন্ত গাড়িতে হামলা করে। ওনার সাথেও এর আগে একবার এরকম হয়েছিল। শুনে তো আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। যাইহোক খুব দুরু-দুরু বক্ষে ওই বিশেষ এলাকাটি পার হয়ে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পঞ্চম দিন আমাদের গন্তব্য কাকোলাত জলপ্রপাত। খুব কম পর্যটকই এখানে আসেন। রাজগির থেকে এই জলপ্রপাতের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিমি। কাকোলাত বিহারের নওয়াদা জেলার ছবির মতো সুন্দর দেখতে একটি জলপ্রপাত। পাহাড়ের ওপরের খাঁজ থেকে প্রায় ১৬০ ফুট নীচে ঝরে পড়ছে এই জলপ্রপাতটি। কিছুটা ঢালাই রাস্তা পেরিয়ে শুরু হয়েছে সিঁড়ি। খুব চরাই নয়। আশেপাশে জঙ্গলে পূর্ণ। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ই


জলপ্রপাতসহ গিরিখাতটি দেখতে অপূর্ব লাগে। জলপ্রপাত থেকে জল পড়ার জায়গাটিতে একটি জলাশয় তৈরি হয়েছে। খুব তীব্রবেগে জল না পড়ার জন্য জলাশয়টি স্নান করার জন্য আদর্শ জায়গা। আমাদের ড্রাইভারদাদা স্থানীয় হওয়ায় এই জায়গাকে ঘিরে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনীটি বলেন। ত্রেতাযুগে কোনও এক রাজা এক ঋষি দ্বারা শাপগ্রস্থ হয়ে একটি অজগর সাপের রূপধারণ করে এই কাকোলাত পাহাড়ে বসবাস করতেন। বনবাসের সময় পঞ্চপাণ্ডব এখানে আসেন এবং রাজাকে শাপমুক্ত করেন। শাপমুক্তির পর রাজা ঘোষণা করেন যে ব্যক্তি এই জলপ্রপাতের জলে স্নান করবে তার সর্পরূপে আর পুনর্জন্ম হবে না। এই প্রবাদে বিশ্বাসী হয়েই অনেকে এখানে স্নান করেন।

অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে ফিরে চললাম রাজগিরের দিকে। আজ আমাদের ফেরার পালা। ৫ দিনের শীতকালীন ছুটি কাটিয়ে এই ঐতিহাসিক শহরকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল যেন এই কটা দিন ইতিহাসের পাতায় পড়া সেই সময়েই পড়ে ছিলাম। কিন্তু ‘নিয়মঘেরা তাসের দেশে’ যে ফিরে যেতেই হবে। তাই রাজগির ভ্রমণের দুর্দান্ত কিছু স্মৃতি নিয়ে বক্তিয়ারপুর থেকে কোলকাতাগামী ট্রেনে চেপে বসলাম।

 

কীভাবে যাবেনঃ কোলকাতা বা হাওড়া স্টেশন থেকে পাটনাগামী যেকোনো ট্রেনে গিয়ে বক্তিয়ারপুর। সেখান থেকে রাজগির  কিমি।

কখন যাবেনঃ বিহারে গরমের আধিক্য থাকায় শীতকালে যাওয়াই ভালো।