সুপর্ণা বোস




'আমাতি'র ভেঁপু
#####
এই যে হঠাৎ এমন মধ‍্যদিনে ভায়োলিন শেখার সখ হল একে কি তোমরা পাগলামো বলবে? বললেও কিছু করার নেই।আমি মানুষটাই এমন।উঠল বাই তো কটক যাই ধরনের।এক্ষেত্রে অবশ‍্য কটক নয়।সোজা লালবাজারে এন.মন্ডলের দোকানে।সেখানে থরেথরে সাজানো আছে বিভিন্ন মান ও দামের বাদ‍্যযন্ত্র।  শিখতে যখন হবে তখন একজন গুরুও তো চাই।সেই গুরুমহাশয়ের সন্ধান দিলেন অপুদা।বেহালার শিক্ষক সত‍্যজিৎ স‍্যার, আক্ষরিক অর্থেই বেহালায় থাকেন।তাঁর সাথে পরামর্শ করে,  কেনা হলো একটি মাঝারি দাম ও মানের বেহালা।

বেহালা এক অদ্ভূত বাদ‍্যযন্ত্র।অতিমাত্রায় সংবেদনশীল।একটুখানি ধরার ভঙ্গি বদল হলে।অথবা বসার আসনে বদল এলে।ছড়টি ধরার এবং টানার ভারসাম্য বিন্দুমাত্র রদবদল  হলেই সে আর সুরে বলবে না।একটু আগেই ঠিক যে অংশটি স্পর্শ করে  হয়তো রে অথবা গা এর বিশুদ্ধ স্বর  বেজে উঠেছে  ঠিক সেখানেই স্পর্শ করে আর অপটিমাল সুরটি পাবোনা তখন। একবার বিমুখ হলে সহজে তার মান ভাঙেনা।

এই রকম সময়ে নিজের অবস্থান সর্বৈব বদলাতে হয়।প্রথমে ছড় নামিয়ে রাখি। তারপর বেহালাটিও রেখে দিই  ধীরে।অতঃপর নতুন উদ‍্যমে আবার বুকে চেপে ধরি সেই অভিমানীকে।ছড়ের ওপর আঙুল রাখি  সাবধানে সুস্থিত ।একটা আনকোরা ষড়জ এর পিঠে একটা সুতন্বী রেখাব।তাদের থেকে একটু দূরে গিয়ে একটা জোরালো গান্ধার। মধ‍্যম এর জন‍্যে দু দুটো আঙুল, অনামিকা ও মধ‍্যমা।যেন শুধু মা নয়, মা এবং বাবা একসাথে।  ডান হাতে ছড় টানি কনুই ও আঙুলের নিখুঁত মনযোগী ভারসাম‍্যে।বিষয়টা কঠিন।কঠিনকে আয়ত্ব করার মধ‍্যেই তো তৃপ্তি।

পঞ্চম, রীতিমত মুক্ত এবং উদাত্ত।তার ভিন্ন ঘর।অর্থাৎ আলাদা তারে বাজেন। তিনি অগ্রবর্তিনী।পশ্চাতে একে একে ধৈবত  নিষাদ এবং ষড়জ।এবং অবরোহের স্বরসমূহ। সাতটি শুদ্ধ স্বরকে শুদ্ধতমভাবে রেসোনেট করা আয়াসসাধ‍্য।সুর এবং স্বরসাধকগন বড় জেদী।প্রকৃতপক্ষে সুরে টিকে থাকাই এক মস্তবড় জেদ।সপ্তসুরের ঠিকুচি নিতে গিয়ে দেখা যায়, সা বা ষড়জ এসেছেন,ময়ূরের কেকাধ্বনি থেকে।রে অধবা রেখাব  এসেছে বৃষ র ডাক থেকে।গান্ধার এসেছেন কিনা ছাগলের ডাক থেকে।ভাবা যায়?   মা অর্থাৎ মধ‍্যম এসেছেন শৃগালের ডাক থেকে।পঞ্চমের উৎপত্তি কোকিলের কুহুডাক। ।ধৈবত এসেছেন হ্রেষাধ্বনি থেকে।সর্বোপরি নিষাদের উৎপত্তি হাতির ডাক থেকে।অর্থাৎ মানুষের সুরের অধিকার সম্ভারে পশু এবং পাখির সরল সহযোগ প্রণিধানযোগ্য।

ভূপ্রকৃতির মানচিত্রে যেমন ছোট্ট একটুখানি লেগুনের  আকৃতি ফুটে থাকে অনেকটা তেমন, এর গড়ন।ছড়টি যেন একটা জলডিঙির মত পারাপার করে।সুর তোলে সা রে গা মা।চারটিমাত্র তারের মধ‍্যে ঘুমিয়ে আছে সুরের রাজকুমারী।তাকে জাগাতে  কম কসরত করতে হয় না।খুব সাবধানে মন বুঝে চলতে হয়।একটা বেফাঁস প্রয়াসে, রেসিপ্রকেশনের কেমিস্ট্রিই বদলে যেতে পারে।

মা এর পর পা এ যেতে গেলে,স্ট্রিং বদল করতে হয়।সুর যেন পাখির মত ছোট্ট মেয়েটি, বড় হয়ে গিয়ে উড়ে যায় ভিনশহরে।সকলই অচেনা।তবু তার ভাল লাগে।এখানে শেকল নেই।এখানে আকাশ স‍্যমন্তকমণির মত নীল।সব উড়ান তো এক নয়। এদিকে আমার মা থেকে পা এ যেতে গিয়ে এলোমেলো স্বর বেজে ওঠে। আমি, মা আর পায়ের ভিতর আরো সচেতন হয়ে উঠি।আরো মৃদু।আরো নিখুত ।

সা যখন একলা ছিল।দিব‍্য ছিল।যখন সা এর সাথে সা এসে বসল,ওমনি একটি নৌকার দরকার পড়ল।দুজনের দূরত্ব।দুজনের ভর।এসব দিয়েই ধরা থাকে সম্পর্কের নৌকা।তুমি তেমনি আমার সা এর পিঠে সা।রে এর কোলে রে।কাছে।তবু দূরে।ঘেষাঘেষি নয়।ঠাসাঠাসি নয়।মাপসই দূরে।তবে তো জীবন সুরে বাজে।

যেবার শান্তি নিকেতন গেলাম তিনটি মেয়ে।কত আনন্দ।একসাথে ভোর দেখছি।একসাথে রাত।হাঁটছি মাইল মাইল পথ।গল্প করছি সুখ দুখের।সেও এক সুর।দীর্ঘ আলাপ। বিস্তার। বিলম্বিত খেয়াল।

 ভায়োলিনটি কোলে তুলে নিই শিশুর মত।তার গা মোছাই নরম আঁচলে।তারগুলোতে আঙুল বুলিয়ে মৃদু কিলকারি তুলি।অথচ ছড় হাতে নিলে সে প্রেমিকের মত বাজে।হাত ধরে নিয়ে যায় সুরের বাগানে।ফোয়ারায় লাল নীল জল।তারের বুকে সুর ওঠে হাওয়ায় ছড়ায়।কাঠের বুকের ভেতর প্রেম ঘাড়গুঁজে থাকে।

আমি তার ইতিহাস খুঁজে দেখি।কোথা থেকে এলো।কতবার নিজেকে বদলালো! ইতিহাস বলছে, , লিথুয়ার নামে ইতালির এক ভদ্রলোক 1555 সালে চারটি তার সমন্বিত  বেহালার একটি ফর্ম তৈরি করেছিলেন।ফরাসী রাজা নবম চার্লস তাঁর কোর্ট-অর্কেস্ট্রার জন‍্যে এক বিশেষ ধরনের বেহালা তৈরির বরাত দ‍িয়েছিলেন যার নাম 'আমাতি'।  

আমাতি হল ইতালীয় বেহালা নির্মাতাদের একটি পরিবারের শেষ নাম যারা প্রায় 1538 থেকে 1740 সাল পর্যন্ত ক্রেমোনাতে বসবাস করত।বর্তমানে এই বংশোদ্ভূত নিকোলো আমাতি  দ্বারা নির্মিত বেহালার মূল্য প্রায় $600,000। তাদের বয়স এবং বিরলতার কারণে, আমতি যন্ত্রগুলি বেশিরভাগ যাদুঘরে বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা হয় এবং খুব কমই জনসাধারণের মধ্যে বাজানো হয়।আমার আবার,  'আমাতি' শুনলে কেমন জানি ' আম আঁটির ভেঁপু' র কথা মনে পড়ে যায়! দুঃখের বিষয় সত‍্যজিৎ রায় মহাশয় তাঁর পথের পাঁচালি চলচিত্রে ( মূল গল্প বিভূতিভৃষণ বন্দ‍্যেপাধ‍্যায়ের ' আম আঁটির ভেঁপু) সেতার ও অন‍্যান‍্য বাদ‍্যযন্ত্রের ব‍্যবহার করলেও এই 'আমাতির ভেঁপুর ব‍্যবহার করেননি। যাইহোক, ।1505 সালে ইতালির চিত্রকর জিওভান্নি বেল্লিনির আঁকা ছবিতে এক সুন্দরী রমনীর হাতে বেহালাযন্ত্রটি দেখতে পাওয়া যায়।সুতরাং বেহালা যন্ত্রের উদ্ভাবন ও ব‍্যবহার বেশ প্রাচীন।
বেহালা যন্ত্রটির মূলত দুটি ভাগ__upper bout এবং lower bout এর মাঝের অংশটির নাম waist. সেখানে দুদিকে দুটি স্মল লেটারের f এর মত f-whole রয়েছে।তারপর আছে বেহালার দীর্ঘ গ্রীবা।যার শেষ প্রান্তে গোটানো স্ক্রোল।সেখানে pegbox এ দুদিকে দুটি করে মোট চারটি কান।তাদের সঙ্গেই যুক্ত আছে চারটি তার।কানে মোচড় দিয়েই তারগুলিকে সুরে বেঁধে রাখতে হয়।অন‍্যদিকে lower bout এর ওপর একটি প্রায় ত্রিভূজাকৃতি কাঠের টুকরো আছে, নাম tail piece.তার ওপর সারি দিয়ে চারটি স্টিলের বোতাম।এগুলি fine_tuner.এগুলিকে মৃদু নাড়াচাড়া করে চারটি তারে সুরকে আরো তীব্র ও পারফেক্ট করা হয়। tail piece ও neck piece এর মাঝখানে,চারটি তারকে শিরোধার্য করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্রিজ।

একেবারে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অঙ্গটি হল ছড় বা bow.সরু কাঠের ছড়ি।যার মাঝের অংশটি সামান‍্য ঢালু।দুটি প্রান্ত যুক্ত করা আছে একগোছা ঘোড়ার লেজের কেশ দিয়ে।যা প্রয়োজনে টানটান করা যায় প্রান্তে আটকানো প‍্যাঁচ ঘুরিয়ে। bow, একজন সুরপ্রয়াসীকে পৌছে দেবে তার প্রার্থিত সুরপ্রাসাদে।

বেহালা ইউরোপীয় যন্ত্র হলেও  ভারতেও খুবই জনপ্রিয়। ইংরেজরা একে 'ভায়োলিন' এবং ইতালীয়রা ‘ভিয়ালো' বলে। 'ভিয়ালো' শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে ‘বেহালা' শব্দটি প্রচলিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।সম্ভবত মোঘল  আমলে পাশ্চাত্য বণিকরা এ যন্ত্র এদেশে নিয়ে আসে এবং ক্রমে তা জনপ্রিয়তা লাভ করে। রাগসঙ্গীত ও লোকসঙ্গীত উভয় ক্ষেত্রেই বেহালা ব‍্যবহৃত হয়।অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বাংলায় আখড়াই গানে এর বিশেষ ব্যবহার ছিল। একক বা সম্মিলিত বাদনে এটি ব্যবহৃত হয়।

ভারতীয় (হিন্দু) মতে, লঙ্কাপতি রাবণ কর্তৃক এক তার বিশিষ্ট "রাবণ স্ত্রম" নামে একটি বাদ্যযন্ত্র সৃষ্টি হয়। যাকে বেহালার ভারতীয় অরিজিন অনেকে মনে করেন।বেহালা প্রকৃতপক্ষে বীণা_পরিবারের সদস‍্য।বেহালা শব্দটি পর্তুগিজ শব্দভান্ডার থেকে আগত।

বেহালার সুর মানুষের কণ্ঠস্বরের মতোই মনোহর।ধনু সহযোগে সুর বেজে উঠলে মনে হয়, বেহালার মূল যন্ত্রটি যেন কাঠের অহল‍্যা।ছড়টি এসে ছুঁয়ে না দিলে তার ভিতর সুর জাগে না।