রোনিয়া রায়

 

জীবন রে !
###

শীত নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই কমলালেবু, নলেনগুড়, খেজুর রস, পিঠে পুলি এসবেরা যেনো ভীড় করে আসে। আসলে আমি খানিক খাদ্যবিলাসী মানুষ। তাই শীত মানে আমার কাছে মনোরম সব খাবার আর নাটকের দল নিয়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ডানা মেলে ওড়া....


কিন্তু  প্রবচনের ডাকে আজ যখন শীত নিয়ে কিছু লিখবো বলে গভীর মনোনিবেশ করছি ঠিক তখনই  কয়েকটা ছবি বলা ভালো কয়েকটা মুহূর্ত মনের মাঝে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে বার বার....

 তাই এই হিমেল বেলায়  আমার জীবনের  সেই মুহূর্তগুলো আপনাদের সাথে খানিক ভাগ করে নিতে বড়ো মন চাইছে আজ।

তখন আমার বয়স  ৮ কি ১০ হবে। বোন আরো কিছুটা ছোটো। তখনও ছাদ জুড়ে অ্যান্টেনাদের ভীড়,  দুপুরে মায়ের পাশে শুয়ে রেডিওতে  শনিবারের বার বেলা শোনা , একটা হ্যারিকেনের আলোতে দুই বোনের পড়তে বসা, শীতের দুপুরে ছাদে পাটি পেতে রোদে পিঠ দিয়ে কমলালেবু খাওয়া আর মায়ের না দেখে অনর্গল  উল বুনে যাওয়ার দিকে অপার বিস্ময় চেয়ে থাকা।

 সময়টা ছিল মাঘ মাস। কথায় বলে মাঘের শীত বাঘের গায়ে। মা গঙ্গার কৃপায় নবদ্বীপে সেই প্রবাদবাক্য প্রতি বছর ভয়ানক সত্যি হয়ে দেখা দিত।
তো এমনই এক শীতের রাতে রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে সবাই লেপের তলায় ঢুকে গেছি। মা তখনো রান্না ঘরে কাজ সারছে। বাবা এক মনে বই পড়ছে, আমি আর বোন কার দিকে কতোটা লেপ বেশী হলো সেই  নিয়ে তখনও টানাটানি করে চলেছি, এমন সময় হটাৎ বাইরের রাস্তার কলটায় কল পাম্প করার ভয়ঙ্কর শব্দ। সেই শব্দ এতোটাই তীব্র  যে বন্ধ দরজা জানলা ভেদ করে তা অনায়াসে ঘরে ঢুকে এলো, সঙ্গে ফুলি পাগলীর চিৎকার। ফুলি পাগলী মাঝে মাঝেই এমন করে, ওকে কেউ তেমন  গ্রাহ্য করে না কিন্তু ইদানিং ফুলি পাগলীর কোলে একটা সদ্যজাত বাচ্চা দেখা যাচ্ছে। মাকে জিজ্ঞেস করে তেমন কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় নি। পাশের বাড়ির পিসি বলেছিলো ওটা নাকি চুরি করা বাচ্চা। সেটাও তখন তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নি। যার বাচ্চা চুরি করলো সে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে তাই হয় নাকি কখনো ?!!

যাই হোক সারা গায়ে অজস্র কাপড় চোপড় জড়ানো কাঁধে এত্তো বড় একটা ঝোলা আর কোলে একটা ছোট্ট পুচকি বাচ্চা। ফুলির এমনতরো একটা বেশ সে সময় আমার শিশুমনে  একটা রোমাঞ্চ মিশ্রিত কৌতূহল তৈরী করেছিলো। তো সেই রাতে ফুলী পাগলীর অমন চিৎকার শুনে বাবা তড়িঘড়ি বারান্দার দিকে ছুটলো। তখনো আমাদের দরজা গুলোতে কাঠের খিল খুললেই বাইরে যাওয়া যেতো। তখনো পাড়ায় কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা মাঝরাত  হলেও বাড়ির লোক দরজায় ,বারান্দায়, জানলায়, এসে দাঁড়িয়ে পড়তো,  দরকারে চেঁচিয়ে পাশের বাড়ির লোক কে ডাকতো অবলীলায়। বাবা কে ছুটে যেতে দেখে আমরা দুই বোন একসাথে একটাই লেপ দুজনে জড়াজড়ি করে দ্রুত ছুটলাম বাবার পেছন পেছন। সমস্ত ঝগড়া তখন উধাও। নিমেষে খুব ভাব দুই বোনের । দুজন দুজনের লেপ ঠিক করে দিচ্ছি তখন। ছুট্টে  বাবার পেছন পেছন বারান্দায় গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমাদের চক্ষু চড়ক গাছ। ওই ঠান্ডায় ফুলি পাগলী তার ওই ছোট্টো বাচ্চাটাকে কলের নিচে শুইয়ে জোরে জোরে কল পাম্প করছে  আর ঝর ঝর করে সেই জল আছড়ে পড়ছে বাচ্চাটার গায়ে আর বাচ্চাটা চিল চিৎকার করছে। ওই দেখে আমার বাবা ভীষণ রেগে গিয়ে প্রবল চেঁচামেচি শুরু করে দিলো, ভুলেই গেলো তখন গভীর রাত। বাবার আওয়াজ এবং বাচ্চাটার কান্নায় এরই মধ্যে বাবনদা, রাজু, দীপ , মনাদি সব বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে এলো।  ঘরের  দরজা, জানলা, বারান্দা থেকে সবাই ফুলিকে ডাকাডাকি  শুরু করে দিলো। সবার এমন আচমকা চিৎকারে ফুলি পাগলী খানিক  ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কলের নীচ থেকে বাচ্চা টাকে তুলে নিলো। বাচ্চা টা তখন ঠক ঠক করে কাঁপছে। বোঝাই যাচ্ছিলো যে ও বেশিক্ষন আর বাঁচবে না। বাবা,হালদার কাকু, রানু কাকিমা তখনো বকাবকি করে চলেছে ফুলি কে।
দোতলায় বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তখন দুই বোন এসব কান্ড কারখানা অবাক বিস্ময়   হাঁ করে দেখছি। ফুলি ততক্ষনে আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে ঘোষ কাকুদের বাড়ির গেট বারান্দায় গিয়ে বসেছে। বাচ্চাকে একটা নোংরা কাপড় দিয়ে গা মুছিয়ে দিচ্ছে।ওপর থেকে  হটাৎ দেখলাম আমার মা  ফুলি পাগলীর পাশে। আমরা সবাই যখন ফুলি কে নিয়ে চিৎকার  চেঁচামেচি করছি মা তখন নিঃশব্দে আসল কাজ টা সেরে ফেলেছে। আমাদের হট ব্যাগ টা নিয়ে পৌঁছে গেছে ফুলির কাছে সাথে একটা ছেঁড়া কাপড়। চোখের নিমিষে মা বাচ্চাটাকে কাপড়ে মুড়িয়ে হট ব্যাগ দিয়ে স্যাক দিতে লাগলো। প্রথমটায় ফুলি বাচ্চাটাকে কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না। মা কে মারতে আসছিল। ততক্ষনে ছন্দা কাকিমা ও গিয়ে দাঁড়িয়েছে মায়ের পাশে। শেষে কি যেনো বুঝে  ফুলি  মাকে বাচ্চাটাকে দিলো। বেশ কিছুক্ষন স্যাক দেওয়া, বাচ্চাটার হাত পা ঘষা এসব চলতে থাকলো। ফুলি কে গাল পারতে পারতে শেষে সবাই ঘরের দরজা দিলো। একসময় আমরাও দুই বোনে ঘরে ঢুকে আবার লেপ শুদ্ধ শুয়ে পড়লাম একদম চুপটি করে।  আমরাও বেজায় ঘাবড়ে গেছি তখন । একসময় মা ঘরে ঢুকলো। বলল বাচ্চাটা বাঁচবেনা বোধ হয়। মানুষের যে কি রুচি....সেদিন বুঝতে পারিনি এই রুচি শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সকল রহস্য।

এর বেশ কিছু দিন পর মায়ের সমস্ত ভবিষ্যত বাণী কে মিথ্যে করে ফুলি কে দেখলাম বাচ্চা কে নিয়ে খেলা করছে রাস্তার ধারে। বাচ্চাটা ও খিল খিল করে হাত পা নেড়ে  হাসছে। আমি দেরী না করে দ্রুত টিউশন এর দিকে পা বাড়ালাম।
বাড়িতে এসেই সোজা রান্নাঘরে। ছুট্টে মাকে গিয়ে বললাম..."মা জানো ফুলির বাচ্চাটা বেঁচে আছে গো"।মা খানিক উদাস হয়ে গেলো। বললো পাগলদের কি আর মাথার ঠিক আছে। দেখ কোনোদিন হয়তো বাচ্চা টাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে, নয়তো ওই বাচ্চাটা ই একটু বড়ো হলে..... আবারো উদাস হয়ে গেলো মা।

এর পর বহুবার বহু জায়গায় দেখেছি ফুলি পাগলিকে। কখনো বাচ্চাটা হামা দিচ্ছে ,কখনো কোলে কখনো আবার ফুলির হাত  ধরে উলঙ্গ নোংরা মাখা ছেলেটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছে ফুলির পাশে পাশে।

 ধীরে ধীরে ফুলি আর ওর ছেলের সাথে দেখা হওয়া কমতে থাকলো আমার। আমি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতায় পড়তে চলে গেলাম। তারপর চাকরী, বিয়ে এবং শেষে কলকাতায় স্থিতি। মাঝে কেটে গেলো বহু বছর। মা কে মাঝে  কয়েকবার জিজ্ঞেস ও করেছিলাম "মা ফুলির ছেলেটা বেঁচে আছে?" মা বলেছিলো " কি জানি....এদিকে আর  আসে না।"

দুবছর আগে শীতের ছুটিতে ছেলেকে নিয়ে নবদ্বীপ ছুটি কাটাতে গেলাম। মা বাবা নাতি জামাই নিয়ে দারুন ব্যস্ত হয়ে পড়লো আর আমি নিশ্চিন্তে  পুরোনো বন্ধুদের বাড়ি টহল দিতে শুরু করলাম। ছুটি দ্রুত শেষ হয়ে এলো। পরের দিন আমরা বেরিয়ে যাবো। লেপের তলায় আমার ছেলে দাদুর সাথে জমিয়ে গল্প  করছে। মা রান্না ঘরে নাতির জন্য পাটি সাপটা বানাচ্ছে। নারকেলের ছাঁই এর মিষ্টি গন্ধে সারাবাড়ি একেবারে ম ম করছে। আমার বর তার প্রিয় গায়ক নচিকেতার গান শুনছে JBL এ। আমি একমনে লাইক কমেন্ট শেয়ার এ ব্যস্ত হয়ে রয়েছি চাদরে পা ঢেকে। বেশ রাত হয়েছে। এরমধ্যে মা দুবার খেতে ডেকে গেছে। এবার উঠতে হবে....

হটাৎ একটা ঘটাং ঘটাং আওয়াজ। আওয়াজ টা একটু ছন্দহীন এবং তার সাথে উচ্চ গ্রামে কিছু কথা...কেনো জানি না হটাৎ বারান্দার দিকে ছুটে গেলাম আমি। না এখন আর খিল খুললেই দরজা খোলা যায় না। এখন আমাদের ইন্টারলক। ছুটে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ছোটো বেলায় পেট ঝুলিয়ে লোক দেখা বারান্দা এখন গ্রিল দিয়ে বাঁধা। মাঝে ছোট্ট একটা ছিটকিনি দেওয়া পাল্লা। সেই ছিটকিনি খুলে পাল্লা সরিয়ে খানিক উঁকি দিতেই দেখলাম... একটি লম্বা লিকলিকে চেহারার যুবক যার গায়ে শত ছিন্ন একটা সোয়েটার। উসখো খুস্কো চুল। পরনে একটা বারমুডা। সে কল পাম্প করে দু হাতের আজলা ভরে একটু দূরে দাঁড়ানো প্রায় বেকে যাওয়া একটা বুড়িকে জল খাইয়ে দিচ্ছে । বুড়ির সারা গায়ে অজস্র চাদর কম্বল মাথায় টুপি মাফলার।প্রত্যেকবার  জল খাওয়ানোর পরে  ছেলেটা চেঁচিয়ে কি যেনো বলছে।  আবার চলে যাচ্ছে কল পাম্প করতে..... আবার এসে খাওয়াচ্ছে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখছি .....
তারপর ছেলেটি ধীরে ধীরে সেই বুড়ির হাত ধরে  এগিয়ে চললো। না  সামনে কোনো বসার জায়গা নেই। সামনে বাড়ির গেট বারান্দা এখন গাড়ি গ্যারেজ। সামনের সমস্ত জানলা ,বারান্দা, ছাদ কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়ে অন্যরকম ভাবে পাখা মেলে আছে আজ। আমি যেনো একটু হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইলাম আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লেপ জড়ানো সেই  ছোট্ট বোনটাকে । বোন নেই....নেই আজ পুরোনো অনেক কিছুই। শুধু একই আছে চোখের সামনে ফুলি আর ওর ছেলের জড়িয়ে থাকা ছবিটা। দুজন দুজনকে আজো ছেড়ে যায়নি। পেছন থেকে নচিকেতার গান বাজছে " আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম"।
মা ডেকেই চলেছে খাবি আয়ে....আর আমি ভেবেই চলেছি...সুস্থতা কি..? পাগলামো কাকে বলে.... ঠিক কোন বন্ধনে বাঁধা পড়লে চূড়ান্ত অযত্নে বড়ো হওয়া, মৃত্যুর মুখ থেকে বারবার ফিরে আসা ছেলেটাও পরম মায়ায় যত্নে সমস্ত গরম জামায় মাকে মুড়িয়ে শক্ত করে হাতটি ধরে হেঁটে যেতে পারে আজো.... শীতের রাতে তৃষ্ণার্ত মায়ের সামনে ধরতে পারে আজলা ভরা জল..! কাকে বলে বেঁচে থাকা.......!?