কুহেলী দাশগুপ্ত(চৌধুরী)

স্বাধীন দেশের বীর সেনানী (শ্রদ্ধাঞ্জলি)                  

##### 

পাক রেজিমেন্টের এক অফিসার এসে বন্দুক কেড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। "ছোড় দো ইন লোগো কো। বহুত হুয়া। কিসিকো মার না মত্"। উল্টোদিকে সারিবদ্ধভাবে চোখ বেঁধে,পেছন মুড়ে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল আট/দশ জন বন্দিকে। সকল বন্দিদের ফায়ারিং করার আদেশ ছিল সেদিন । সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকাল। অশান্ত বাংলাদেশ, চারদিকে কার্ফু জারি হয়েছে।


   
 তখন গন্ডগোল শুরু হয়েছিল গ্রামের দিকে। শহরে ততটা প্রভাব পড়েনি। গ্রামের বউ ,ঝি দের সাবধানে লুকিয়ে থাকতে হোত। দেশের রাজাকার  বিভীষণ মারফত খবর চলে যেত পাক মিলিটারিদের কাছে। সোমত্ত ঘরের মেয়ে বউরা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না।

 এমনই একদিন শহরের বাড়িতে পরিবার সমেত কিছু আত্মীয় পরিজনদের সাথে উদ্বিগ্ন অবস্থায় ছিলেন এক সময়ের স্বদেশী যুগের বিপ্লবী শ্রীযুক্ত হরি রাখাল দত্ত মহাশয়। শহরের রাস্তায় কার্ফু চলছে। এমন সময় কিছু বন্দুকধারী পাক মিলিটারী এসে দরজায় করাঘাত করে। বাড়ির মহিলাদের একঘরে লুকিয়ে রেখে তালাবন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর দরজার খোলার পরে,হুড়মুড় করে ঢোকে পাক সেনা। বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে বলে,"দরওয়াজা খুলনেমে ইতনা দের কিঁউ? তুম মুক্তি হ্যায় কেয়া? " হরি বাবু দমবার পাত্র নন। তিনি ভয় না পেয়ে বলেন," কোয়ি মুক্তি কো নেহী জানতা। অাব কার্ফু চল রাহা হ্যায়। অাপ লোগ ইস হালত মে সড়ক পর ঘুমকে ইধার আয়া! সব কো বাতা দুঙ্গা। ইয়ে কানুন তোড়না জুলুম হ্যায়"। পাক সেনা কিছু হুমকি ছুড়ে দিয়ে চলে যায়।


 এরপর শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব প্রবল আকার নিলে, হরি বাবুর নন্দন কাননের বাড়িতে ওনার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় পরিজন আসেন। আবার ও সেখানে একদিন পাক বাহিনীর হানা।ধরে নিয়ে যান হরিবাবু,ওনার দাদার ছেলে মৃদুল দত্ত এবং ছোট শ্যালক দুলাল দাস কে।  হরি বাবুর অাশি বছরের বৃদ্ধ শ্বশুরমশাই পিছু নেন।তারা বৃদ্ধ আর শিশুদের ওপর অত্যাচার করত না।জেলে নিয়ে হরি বাবুদের ওপর প্রচন্ড অত্যাচার করে সন্ধ্যের দিকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এত অত্যাচারের পর হরি রাখাল বাবু দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা নেন। উনি বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। বড় সংসারে ছয় মেয়ে অার তিন ছেলেকে প্রতিপালন করে একে একে বড় অার মেজ মেয়েকে সুপাত্রস্থ করেছেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর প্রথমে সেজ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এক কন্যা তখনো বিবাহ যোগ্যা, অতি সুন্দরী। বড় ছেলে পড়াশুনো করছে কলকাতায় ।বাকি চারজন তখনো নাবালক নাবালিকা।
 
মেজ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন করনখাইন গ্রামে দত্ত বাড়িতে। সেখানে পরিবার নিয়ে থাকাকালীন কিছু জরুরী প্রয়োজনে শহরে  যাওয়ার সময় সাথে ছিলেন হরিবাবুর বেয়াই মেজ মেয়ের শ্বশুর শ্রীযুক্ত মাধব দত্ত মহাশয়। পথে আবার পাক সেনার কবলে পড়েন। ওনার বেয়াই মশাই মাধব দত্তকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিলে ও হরি রাখাল বাবুকে নিয়ে গেলেন। প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভিজিয়ে ওনাকে বেদম প্রহার করা হয়।১মাস২১দিন জেলে বন্দি থাকাকালীন ভীষণ রকম অত্যাচারিত হন। সেই সময় দুটি যুবকের সাথে ওনার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাঁরা কাছে বসে গল্প করতেন। বাড়ির খাবার এলে হরি বাবুকে খাওয়াতেন সাথে। জেলে দুঃসহ জীবনে এক.ঘটিতেই  জল খাওয়া ও প্রাত্যহিক কাজ সারা -সবই করতে হয়। ওনার স্ত্রী প্রতিভা দত্ত তাঁর ভাসুরপো মৃদুল দত্তকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে যেতেন ওসি কে অনুনয় বিনয় করে স্বামীকে ছাড়ানোর জন্য। বার বার প্রত্যাখান নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।বাড়িতে ছেলে মেয়ে দের চিন্তা, এদিকে স্বামীর বন্দি জীবন- সব নিয়ে প্রতিভা দেবী প্রভাবশালীদের কাছে গিয়েও ফল পাননি। তারপর একদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে ছেলে মেয়েরা  দেখতে পায়- একগাল দাড়ি ,উস্কোখুস্কো চুল, পরনে আধময়লা লুঙ্গি এক অসহায় মানুষ যিনি তাদের বাবা হরি রাখাল দত্ত। এতদিন পরে এই অবস্থায় বাবাকে পেয়ে ছেলেমেয়েরা জাপটে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। বেঁচে ফিরবেন, এই আশাই কেউ করতে পারেনি।

   উপরি উক্ত কাহিনির শ্রদ্ধেয় হরি রাখাল দত্ত আমার মাতামহ । আমি ওনার সেজ মেয়ের ঘরের নাতনী। ছেলেবেলাকার দিনগুলিতে মায়ের চোখ দিয়ে দাদুকে দেখেছি।আমার মা সুচিতা দাশগুপ্ত দাদুর স্বদেশী জীবনের গল্প করতেন আমাদের খাইয়ে দেওয়ার সময়। আমার মাসি শ্রীমতি শুভ্রা দাস রায় এর কাছও দাদুর জীবন কথা  কিছু জানতে পেরেছি ।
     অষ্টম শ্রেনীতে পড়ার সময় দাদু মাস্টারদা সূর্যসেন এর বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত হন।বিপ্লবী সুখেন্দু দস্তিদার দাদুদের টিউশান পড়াতেন। যাঁকে দাদু কাকু বলে সম্বোধন করতেন।পরে অবশ্য উনি দাদুর  সম্পর্কে ভগ্নিপতি হন। ওনার অনুপ্রেরণাতেই দাদু বিপ্লবী দলে যোগদান করেন । তবে, দাদুর বাবা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না বলে, মাস্টারদা বাড়ি গিয়ে দাদুর বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন।অামার দাদু ছিলেন বোয়ালখালি উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের ছেলে। এই গ্রামেরই আরেকজন স্বনামধন্য বিপ্লবী বীরাঙ্গনা ছিলেন কল্পনা দত্ত, যিনি বিবাহোত্তর কল্পনা যোশী নামে পরিচিত হন। বিপ্লবী দলের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হওয়ার পর  সাত বছরের জন্য দাদু রাজবন্দি ছিলেন। বন্দি থাকাকালী তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেন।জেল থেকে উপহার স্বরূপ দাদুকে একটা বড় আয়না দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে আমাদের খাতুনগঞ্জের বাড়িতে ছিল। বিপ্লবী জীবনের সাথে সংসার জড়াতে চাননি বলে ,উনি অকৃতদার থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সংসারের চাপেই দাদুকে বিয়ে করতে হয়। নতুন বউকে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সাথে রেখে উনি 

আবার বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িয়ে যান। মাঝে  মাঝে এসে দেখা করেন। সংসার বাড়লে জীবনে দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিতে হয়। তেমনি দাদুকে দেশের কাজ হতে অব্যাহতি নিয়ে চাকরি নিয়ে দায়িত্ব পালনে মন দিতে হয়। "হাকিম অ্যান্ড সন্স " এ ম্যনেজার পদে চাকরি করেছেন কিছুদিন। পরে নিজস্ব কিছু ব্যবসা ও করেছিলেন।  

   মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী কালে ভারতবাসী হয়ে দাদু অনেকদিন চাকরিরত ছিলেন। গোলপার্ক "মৌচাক মিষ্টান্ন ভান্ডারে" ও ম্যানেজার পদে ছিলেন। কোনদিন মাথা নোয়াননি কারো কাছে। ভারতবাসী হয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কষ্টের সংসারে উনি নিজে পরিশ্রম করেছেন।  অামার ছেলেবেলায় কলকাতায় এসে একবার দাদুর সাথে  সময় কেটেছিল কিছুদিন। কোন্নগর নবগ্রামে দাদুর বাড়ি ছিল খামার বাড়ির মতো। সামনে বাগানে নানা রকম ফুলের গাছ ,পেছনের বাগানে ফল সবজির বাগান, বাড়িতে শখের পোষা দুটি সাদা ছাগল ছিল। নাক চেপে ছাগলের দুধ খেয়েছিলাম। দাদু, মাসি ,দিদা, মামাদের সাথে খুব আনন্দে কেটেছিল সেবার। তারপর আর দেখা হয়নি দাদুর সাথে। ১৯৮৬ সালের ২৬শে মে দাদু ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে যান।অনেকদিনের ডায়াবেটিক পেশেন্ট ছিলেন। শেষদিকে মাল্টি অর্গান ফেলিওর হয়।দাদুর জীবন কথা কষ্টের হলেও ওনার দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রমের কথা ভেবে গর্ব অনুভব করি। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীজির হাত থেকে পাওয়া তাম্রপত্র দাদুর বিপ্লবী জীবনের এক বড় সম্মান।

    দাদুর স্বদেশী জীবনের সমসাময়িক বিপ্লবী বন্ধু ছিলেন আমার মেজ পিসেমশাই মধু সিংহ । পিসেমশাইয়ের বিপ্লবী জীবনের কথা সেভাবে জানা হয়নি । শ্রদ্ধেয় অনন্ত সিংহ ,লোকনাথ বল, গণেশ ঘোষ,পরেশ দাশ,অর্ধেন্দু গুহ এনারা দাদুর বিপ্লবী বন্ধু ছিলেন। বিপ্লবী পরেশ দাশ অামার কনা পিসির মামাশ্বশুর ছিলেন।  বিপ্লবীঅর্ধেন্দু গুহ কে আমি দেখেছি। উনি আমার কনা পিসির বড় ননদাই। দেখতে ছোটখাটো ছিলেন, তাই বিপ্লবী দলে ওনাকে শিশু নামে ডাকা হোত। বিপ্লবী পরেশ  দাশ অকৃতদার ছিলেন । অামার বিয়ের পর জেনেছিলাম বিপ্লবী বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার  ছিলেন আমার শ্বশুর মশাই স্বর্গীয় সলিল প্রসূন চৌধুরীর আপন মাসতুতো দিদি।  মনে রোমাঞ্চ জেগেছিল । আর একজন সশস্ত্র বিপ্লবীর কথা জেনেছিলাম আমার মেজ জা তনিমা চৌধুরীর কাছে। উনি শ্রদ্ধেয় সুবোধ রায়। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিলেন। জালালাবাদ পাহাড় অপারেশনে ওনার অনেক সহযোদ্ধা বিপ্লবী শহীদ হলেও উনি বেঁচে ফিরেছিলেন। আমার জা এর সম্পর্কে উনি জেঠু ছিলেন। জা এর মেসোর বড়দা। অালিমুদ্দিন স্ট্রীটে ওপর তলার একটি ঘরে তিনি শেষ জীবন কাটিয়েছেন। বিয়ে থা করে সংসারী হননি। সুবোধ রায়ের লেখা "Chittagong

Armoury Raid" অস্ত্রাগার লুন্ঠনের গৌরব গাথার স্বাক্ষর।আন্দামান সেলুলার জেলে উনি আট বছর বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। জেলের স্মৃতি ফলকে অন্যান্য বিপ্লবীদের নামের সাথে ওনার নাম খোদাই করা আছে।

স্বাধীন ভারতবর্ষ, স্বাধীন বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে স্বাধিকার নিয়ে অবস্থান করছে কত বিপ্লবীদের আত্ম বলিদানে। নাম জানিনা আরো কত শহীদের। বরকত, রহিম , আবুল এমন কত দেশপ্রমীদের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে।সকল বিপ্লবী, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। বিপ্লবী, শহীদের স্মৃতি    
অমর হোক সকলের মনে।

বিপ্লবী হরি রাখাল দত্ত ও তাম্রপত্রের ছবি সৌজন্যে : শ্রীমতি শুভ্রা দাস রায় ও শ্রী সরোজ দত্ত