পয়মন্ত
###
'রাইতের বেলা মস্করা করতাস?'
'আমি, আমি মস্করা করছি? '
'তুমি না ত কী আমাগো পড়শী বাবুলের মা করতাসে? '
'এ তো আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল! এই শীতের কনকনে রাতে আর জ্বালিও না অভির মা'
'হ,আমিই তো জ্বালাইতাসি, ল্যাপের ছিটেফোঁটাও আমার গায়ে আসে? ভালো কইরা তাকায় কও দেহি' অভির মায়ের গলা বুজে আসে, নাক টানে জোরে।
'কালকেই অভিকে একখানা কম্বল কিনে আনতে বলব, যে যার, তার তার, এই অশান্তি আর ভালো লাগছে না বাপু'
'এহন তো তাইই বলবা, সাতাইশি বৎসরের বুড়া,ল্যাপ তো আলাদা করবই। এ আমার মার দেওয়া ল্যাপ, এরে আমি বুকের ধন ভাবি, বুঝছ,এ বড় পয়মন্ত। দুইজনরে এক লগেই গায়ে দেওন লাগে, অন্য কিছু গায়ে দেওনের কথা মুখেও আনবা না'
'উফফ,পায়ে পড়ি তোমার অভির মা, আমার কেমন শরীর আনচান করে এখন, একেই কত রাতে ঘুমাই, তারপর তুমি যদি এসব কথা বলে রাত কাবার করো, ভালো লাগে! লেপ নাকি আবার পয়মন্ত!'
এসব কথা ত আগের বছরের শীতেই হয়েছে।
অভির মা, অভির বাপের গা থেকে লেপের খানিকটা আবার নিজের গায়ে টেনে নিয়েছে। একটু ঘন হয়ে বুকে হাত বুলিয়ে দিয়েছে।
মায়ের দেওয়া লাল শালু কাপড়ের লেপ। পঞ্চাশ বছরে সে টুকটুকে লাল রঙ ফিকে হতে হতে প্রায় অদৃশ্য। ওয়ার বদলেছে মাঝেমধ্যে।তুলো গুলো জায়গায় জায়গায় দলা পাকিয়ে গেছে। বাবা সবথেকে দামী তুলো দিয়ে, সেরা ধুনুরী দিয়ে এ লেপ বানিয়ে দিয়েছিল আদরের শ্যামলী কে। মনা বলে ডাকত বাবা। এদেশীয় ছেলেকে মায়ের মোটেই পছন্দ ছিলনা। পদ্মা পাড়ের মানুষ তারা। এখনও ভাষা, খাওয়া, পরা ছাড়তে পারেনি পুরোটা প্রাণে ধ'রে। খোঁটা শুনতে না হয় শ্যামলীকে , বাঙাল বাড়ির মেয়ে বলে।
মায়ের ভয়কে জয় ক'রে ফেলে জমিয়ে সংসার করেছে শ্যামলী।
পাশের খালি জায়গায় হাত বোলায় সে। আজ এই শীতে তার গায়ের লেপ টেনে নেওয়ার জন্য পাশে কেউ নেই আর।
হঠাৎ চাপা অথচ তীক্ষ্ণ বাদানুবাদ কানে আসে শ্যামলীর,পাশের ঘর থেকে, । প্রায় প্রতিদিনের মতো। শীতের নিস্তব্ধ রাতে পরিস্কার শোনা যায়।
অভি আর রিয়ার কেন যে এতো বিবাদ,কথায়, কথায়। বোঝেনা শ্যামলী, ত্রিশ বছর এক ছাদের তলায় থাকার পরেও। নাতনীটা কতদূর চলে গেল চাকরি নিয়ে, পড়াশোনা শেষ করেই। তার মনে হয়, বাবা, মায়ের অশান্তি এড়াতে বাধ্য হয়ে চলে গেছে মিতুল। লেপটা কান অবধি টানে। পা গুটিয়ে আনে কোলের কাছে।
আপন মনে বলে, 'এ ল্যাপ খান অভিরে দিয়া দিমু, ভারি পয়মন্ত এ ল্যাপ। আমাগ কত্ত ভাব ভালবাসা ছিল রে অভি। শীত আইলেই তা কেমন আরো ঘন হইত গিয়া। চইক্ষে হারাইত সে মনিষ্যিটা আমারে। আমাগ বিবাদ ছিল দুধের সর। কেমন মন্দ কথা কস, অভি, দুইজনাই।তয় আমাগ পোলা, হেইডা আশ্চয্যি লাগে ভাষা শুইন্যা। এ ল্যাপ দিয়া দিমু তগো।আমি অহন আর এ ল্যাপ নিয়া করুম কী!মনিষ্যিটার ছোঁয়া আছে গিয়া, এ ল্যাপে।তবু,দিয়া দিমু। তগো পিরীতি গাঢ় হইব গিয়া'
চোখে ঘুম নামে শ্যামলীর নিশ্চিন্তে। মায়ের দেওয়া সেগুন কাঠের খাটে, মায়ের দেওয়া লেপের ওমে।
অভি, রিয়ার ঘরে ঝাঁ, চকচকে নতুন আসবাব। আধুনিক।
সিন্থেটিক তুলোর নরম কম্বল।
পয়মন্ত লেপের যে কত প্রতিদ্বন্দ্বী।
সারা রাত ঘন কুয়াশা জমাট বেঁধে থাকে শ্যামলীর বাড়ির চারপাশে।